ভয়েস অফ গোপালগঞ্জ ডেস্ক,
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। ঘটনাটি স্থানীয় সাংবাদিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা মামলাটিকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক উল্লেখ করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৬ জুলাই) গোপালগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে ঠিকাদার মো. ইয়াসিন হোসেন মামলাটি দায়ের করেন। আদালতের বিচারক রাইফা সরকার মামলাটি আমলে নিয়ে সমন জারির আদেশ দেন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, সড়কের পিচ ঢালাইয়ের সময় আমার দেশ ও ডেইলি পোস্ট পত্রিকার কোটালীপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলসহ অজ্ঞাত ৪-৫ জন ঠিকাদারের কাছে দেড় লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয় এবং অজ্ঞাত ব্যক্তিদের দিয়ে সড়কের কার্পেটিং উঠিয়ে ফেলা হয়।
তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজে শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও বিভিন্ন কারিগরি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত ৩০ জুন এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের নকশায় রাস্তার দুই পাশে প্রায় তিন ফুট করে মাটির শোল্ডার নির্মাণের কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে তা করা হয়নি। এছাড়া এজিংয়ের কাজে নিম্নমানের ও পুরোনো ইট ব্যবহার, প্রাইম কোট ও ট্যাক কোট যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা এবং বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ে মান বজায় না রাখার কারণে কাজ শেষ হওয়ার মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে যেতে শুরু করে। হাতের স্পর্শেই পিচ উঠে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ ঘটনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে গত ৬ জুলাই আমার দেশ–এর অনলাইন সংস্করণে "কোটালীপাড়ায় সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, কার্পেটিং উঠে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল" শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
সাংবাদিক মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েলের দাবি, সংবাদ প্রকাশের আগেই ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেন মোবাইল ফোনে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেন এবং প্রকাশ করলে চাঁদাবাজির মামলায় জড়ানোর হুমকি দেন। সংবাদ প্রকাশের পরই তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। তার অভিযোগ, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি আড়াল করতেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ মামলা করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সময় টেলিভিশনের প্রতিনিধি জয়ন্ত শিরালী বলেন, তিনিও ওই সড়কের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, সাংবাদিকরা সেখানে কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগের সময় মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলেও তিনি দাবি করেন। তাই এ ধরনের মামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত।
গোপালগঞ্জ টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাবেরুল ইসলাম বাধন বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। মামলা প্রত্যাহার না হলে সাংবাদিক সমাজ কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে বলেও তিনি জানান।
কোটালীপাড়া থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি সুধান্য ঘরামী বলেন, ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। এই সড়কের কাজেও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও একাধিকবার কাজের স্থান পরিদর্শন করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাগুফতা হক জানান, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নজরে এসেছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) 'গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)'–এর আওতায় প্রায় ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২৬৫ মিটার দীর্ঘ শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কার্যাদেশ পায় চুয়াডাঙ্গার জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন ঠিকাদার ইয়াসিন হোসেন।
এলজিইডির গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এহসানুল হক বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর কারিগরি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্তে অনিয়ম বা ত্রুটি প্রমাণিত হলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারকে প্রয়োজনীয় সংশোধনী কাজ করতে হবে।
মন্তব্য করুন