নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : Oct 2, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

গোপালগঞ্জে জীবিকার নতুন উৎস লাক্ষা পোকার ‘রজন’

ভয়েস অফ গোপালগঞ্জ ডেস্ক,

গোপালগঞ্জে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সন্ধান দিয়েছে লাক্ষা পোকা। এ পোকায় আক্রান্ত গাছ থেকে রজন সংগ্রহের মাধ্যমে জীবিকার নতুন উৎস পেয়েছেন অন্তত চারশো মানুষ।

রজন প্রতি কেজি ৩৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে এতে একজন দিনমজুর প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন বলে জানিয়েছেন তিন বছর আগে গোপালগঞ্জ শহরে রজনের ব্যবসা শুরু করা সোহেল রানা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই যুবক গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে এখন শহরের গোবরা সোবাহান সড়কে রজনের ব্যবসা করছেন।

তিনি বলেন, চাপাইনবাবগঞ্জে অনেক দিন থেকেই রজনের ব্যবসা চালু আছে। তবে গোপালগঞ্জের মানুষ এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানত না। তাই আমি ৩ বছর আগে এখানে প্রথম রজন সংগ্রহ ও বিপণন ব্যবসা শুরু করি।



“এখন এ জেলার দিনমজুর শ্রেণির অন্তত ৪০০ মানুষ রজন সংগ্রহ করে আমার কাছে বিক্রি করেন। অপ্রচলিত প্রক্রিয়াজাত পণ্যটি আমি প্রতি কেজি ৩৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায় ক্রয় করি।

তিনি সপ্তাহে ২ দিন ১৫ থেকে ২০ মণ রজন চাপাইনবাবগঞ্জে পাঠান জানিয়ে বলেন, “সেখানে রজনের ফ্যাক্টরি আছে। তারা রজন দিয়ে কাঠের রংয়ের কাজে ব্যবহৃত গালা তৈরি করে। এমনকি ভারত, চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও রজন রপ্তানি হয়।”

এছাড়া বগুড়া, ফেনী, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতেও রজনের রপ্তানিকারক রয়েছে বলে জানান তিনি।

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান তাহমিনা বেগম বলেন, “লাক্ষা পোকামাকড় প্রধানত রেইনট্রির ডালের রস খেয়ে জীবন ধারণ করে। তাদের শরীর থেকে এক ধরনের আঠালো পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা গাছের ডালেই লেগে থাকে। সেই পদার্থই রজন আকার ধারণ করে।”



এ শিক্ষক আরও বলেন, লাক্ষার রজন বারবার চূর্ণ করে ছেঁকে নেওয়া হয়। যাতে রজন হিসাবে ব্যবহারের জন্য অমেধ্য এবং পোকামাকড়ের অংশ অপসারণ হয়। উৎপাদিত পণ্যকে বলা হয় ‘সিডল্যাক’। বিশ্বব্যাপী এটি কাঠের সাজসজ্জা এবং বার্নিশ হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সেইসাথে উল, সিল্ক, চামড়াজাত পণ্য রঙ করতেও এটির ব্যবহার রয়েছে।

এছাড়া প্রসাধনী, জুস, কার্বনেটেড পানীয়, ওয়াইন, জ্যাম, সস এবং ক্যান্ডিসহ বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুত করতে রাজন বহুল ব্যবহৃত। গহনার রং, আয়ূর্বেদিক চিকিৎসায় ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরিতেও লাক্ষার ব্যবহার আছে।

একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে প্রায় ৬-১০ কেজি লাক্ষা সংগ্রহ করা যায়। এটি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে নতুন অর্থনৈতিক পণ্যে পরিণত হয়েছে বলে জানান ওই শিক্ষক।

দুই বছর ধরে লাক্ষা রজন সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত আছেন মুকসুদপুর উপজেলার মোচনা গ্রামের হাসান মোল্লা।

তিনি বলেন, প্রথমে কিছু রজন সংগ্রহকারীকে দেখে আমার মনে হয়েছিল এটি কোনও ধরনের প্রতারণামূলক কাজ। পরে আমি জানতে পারি যে এ রজন খুবই মূল্যবান, সংগ্রহ করে ভাল টাকা আয় করা যায়।

“তাই ভ্যান চালানোর কাজ ছেড়ে আমিও রজন সংগ্রহের কাজ শুরু করি। এখন এটি আমার প্রধান পেশা হয়ে উঠেছে।”

প্রতিদিন ভোর থেকে লাক্ষা পোকা আক্রান্ত গাছের সন্ধান শুরু করেন জানিয়ে তিনি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে বৃক্ষপ্রবণ এলাকাজুড়ে আমরা লাক্ষা পোকা আক্রান্ত গাছের সন্ধান করি। পরে বিভিন্ন দামে আক্রান্ত গাছের ডাল কিনে কেটে নিয়ে আসি।



“পরে গুদামে এনে ডাল থেকে রজন ছাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। এতে প্রতিদিন দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছি।”

একই উপজেলার কালিনগর গ্রামের আব্দুর রহমান বলেন, “রাস্তার পাশের গাছের ক্ষেত্রে আমাদের কোনও অর্থ প্রদানের প্রয়োজন হয় না। তবে মালিকানাধীন গাছের ক্ষেত্রে, প্রতিটি গাছের জন্য মালিককে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “দিনের বেলা ডাল সংগ্রহ করার পর, আমরা সন্ধ্যায় সেগুলি প্রক্রিয়াজাত করি। তারপর ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি। আমরা দিনে ১২ থেকে ১৫ কেজি রজন সংগ্রহ করতে পারি। প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করি।”

ভাবড়াশুর গ্রামের সেন্টু মৃধা বলেন, লাভজনক হওয়ায় উপজেলার ২ শতাধিক নারী, পুরুষ এ পেশায় জড়িত হয়ে পড়েছে। বেকার যুবকরাও খণ্ডকালীন ব্যবসা শুরু করেছে। উপজেলার গায়েন্দা বাজারে একটি ঘর নিয়ে আমরা ছুরির সাহায্যে ডাল থেকে রজন আলাদা করি।

এখানে রজন ছাড়ানোর কাজ করেন ১০ জন নারী কর্মী। সাত দিনের সংগ্রহ করা রজন আড়তদারের কাছে বিক্রি করি। প্রথম দিকে প্রতি কেজি ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি করতাম, তবে এখন দাম কমে গেছে।”

লাক্ষা সংগ্রহের এ প্রক্রিয়া রেইনট্রি গাছের তেমন ক্ষতি করে না বলে মন্তব্য করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামরাবাড়ির উপ-পরিচালক আব্দুল কাদের সরদার।

তিনি বলেন, “সংগ্রহকারীরা রেইনট্রির রজন সমৃদ্ধ ডালপালা কেটে নেন। এতে গাছের মালিক, সংগ্রহকারী ও আড়তদাররা লাভবান হন। পাশাপাশি লাক্ষা আক্রান্ত ডাল কেটে নিলে রেইনট্রিতে আবার নতুন ডাল গজায়।”

এছাড়া বরই, বাবলা ও পলাশ গাছেও লাক্ষা পোকার সংক্রমণ হয় বলে জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গোপালগঞ্জে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ

1

মেডিকেল-ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা, জানা গেল আবেদনের

2

গোপালগঞ্জে একসঙ্গে আওয়ামী লীগের দুই নেতার পদত্যাগ

3

আজ মহাঅষ্টমী, হবে কুমারী পূজা

4

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যেতে বাংলাদেশের সামনে কঠিন সমীকরণ

5

“ভোটের গাড়ি”-এখন গোপালগঞ্জে

6

গোপালগঞ্জের তিন আসনে ভোটার ১০ লাখ ৮২ হাজার ৬৫৩

7

গোপালগঞ্জে বৈদ্যুতিক শকে শ্রমিকের মৃত্যু

8

চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন বিজ্ঞানী

9

গোপালগঞ্জে দেশের প্রথম এফআরপি টাওয়ার স্থাপন করল ইডটকো

10

পদ্মার ভাঙনে বিলীন ফসলি জমি ও শ্মশানঘাট

11

অতীতের সব মাফ করে দিয়েছি: গোপালগঞ্জে জামায়াত আমির

12

৭ ফরোয়ার্ড নিয়ে ব্রাজিলের শক্তিশালী দল ঘোষণা

13

ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের ব্যাপক বিজয়

14

ভিন্ন রূপে কেয়া পায়েল, নেটদুনিয়ায় চমক

15

লবণ বেশি খেলে কী ঘটে শরীরে জেনে নিন

16

ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে ডাকসুর নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যন

17

মেহেরবানি করে চাঁদাবাজি করবেন না, রাজশাহীতে কর্মী সম্মেলনে জ

18

গোপালগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সহকারী শিক্ষক

19

গোপালগঞ্জে গরু চুরি করে পালানোর সময় খাদে পড়ে পিকআপে আগুন

20